করোনার সাথে ঠান্ডার কী সম্পর্ক?

অনেকে মনে করেন করোনাভাইরাস ঠান্ডাজনিক রোগ। বিষয়টি যেমন ঠিক নয় তেমনি আবার এড়িয়েও যাওয়া যায় না। কেননা শীতপ্রধান দেশগুলোতেও নতুন আক্রান্তের

সংখ্যা বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোয় গরমের সময়েও করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার দেখা গেছে। খবর- বিবিসি বাংলার এদিকে, বাংলাদেশে শীতের সময় করোনাভাইরাসের আরেক দফা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। এজন্য নানা প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। গত কিছুদিন ধরে নতুন সংক্রমণ ও

মৃত্যুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। শীত বা ঠান্ডার সাথে করোনাভাইরাসের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। তবে করোনাভাইরাসের অন্য যে গোত্রগুলো রয়েছে, যার কারণে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়, সেসব ঠান্ডা পড়লে বেড়ে যায় বলে দেখা গেছে। করোনাভাইরাস মোট চার রকমের আছে -যা সাধারণ সর্দি জ্বরের লক্ষণ সৃষ্টি করে। প্রতিটিই সহজে ছড়ায় শীতের সময় । ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস এবং আরএসভি নামে আরেকটি ভাইরাস – এর

সবগুলোরই আচরণ মোটামুটি একই রকম। কিন্তু গবেষক ও বিজ্ঞানীরা দেশভেদে এর বিভিন্ন রকমের চিত্র দেখতে পেয়েছেন। বাংলাদেশের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘যদিও ভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কমে আসার পর এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে, তবে ঠান্ডার সাথে বা তাপমাত্রার সাথে করোনাভাইরাসের বাড়া-কমার কোন সম্পর্ক আছে, সেটা আমরা এখনও পাইনি। করোনাভাইরাস বিশ্লেষণে সবকিছুই একেবারে নতুন ধরনের দেখা যাচ্ছে। ’ যেমন-বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়েছে মার্চ মাসে, যখন এখানে শীতকাল শেষ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে মে, জুন, জুলাই মাসের দিকে, যখন বাংলাদেশে পুরো গরম থাকে। প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ফলে করোনাভাইরাস বিস্তারে গরম আবহাওয়া কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। গরম প্রধান অনেক দেশেও ভাইরাসের বিস্তার ঘটতে দেখা গেছে। শীতপ্রধান দেশগুলোয় গ্রীষ্মের সময়েও করোনাভাইরাসের বিস্তার বন্ধ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘যেসব গবেষণা হয়েছে, সেখানে ঠান্ডার সাথে এই ভাইরাসের বিশেষ সম্পর্ক আছে, ঠান্ডা বাড়লে ভাইরাসের বিস্তার বাড়বে, এমন কিছু এখনো পাওয়া যায়নি।’ তবে করোনাভাইরাসের বিস্তারে ঠান্ডা বেশি দায়ী, নাকি মানুষের আচরণ- এ নিয়ে

বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো দ্বিমত আছে। বিবিসির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আবহাওয়া নয়, বরং সেখানকার কর্তৃপক্ষের নীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা, জনসাধারণের সচেতনতা ইত্যাদি অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। বিভিন্ন দেশে গিয়ে ভাইরাসটি তার আচরণও বদল করছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে একেক দেশে করোনাভাইরাসের একেক রকম আচরণ দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং অণুজীব বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘যে তাপমাত্রায় এই ভাইরাসটি বাড়ে, সহজে সংক্রমিত করতে পারে বা নিজের দ্রুত বিস্তার ঘটাতে পারে, শীতকাল সেটার জন্য আদর্শ। এ কারণেই ধারণা করা হচ্ছে যে, শীতকালে এই ভাইরাসের বিস্তার বেশি হতে পারে। ’ এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় হাঁচি, কাশি দেয়া হলে বাতাসে জীবাণুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো অনেকক্ষণ ধরে ভেসে থাকে। গরমের সময় সেটা যখন দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু শীতের সময় অনেকক্ষণ ধরে বাতাসে থাকে। ফলে মানুষের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। ‘শীতকালে মানুষ ঘরের ভেতর বেশি থাকে, দরজা জানালা বন্ধ থাকে। পরিবেশটা শুষ্ক থাকে, মানুষজনও কিছুটা কাছাকাছি বসবাস করে। ফলে এই সময় ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ বেশি থাকে।’ যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের জন্য বিশেষ করে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিশেষ অনুকূল বলে দেখা গেছে। করোনাভাইরাস পরিবারের অন্য যেসব ভাইরাস রয়েছে, সেগুলোও ঠান্ডা আবহাওয়ায় বিস্তার বেশি ঘটে বলে দেখা গেছে। করোনাভাইরাসের জীবাণুর ক্ষেত্রে যে নিউক্লিয় এনভেলাপ থাকে, অর্থাৎ ভাইরাসের বাইরে যে আবরণ থাকে, যেটি জীবাণুর জেনেটিক কণাগুলোকে ঘিরে রাখে সেটাকে বলা হয় লিপিড মেমব্রেন। এই আবরণটা তৈলাক্ত ধরনের। শীতকালীন পরিবেশে সেটা অনেকক্ষণ টিকে থাকতে পারে। ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মিও কম থাকে। তবে সার্স-কোভ-২ নামের এই ভাইরাস ঠান্ডা পড়লে বেশি ছড়ায়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকরা বলছেন, ‘একেক দেশে গিয়ে ভাইরাসটি তার চরিত্র বদল করছে। ফলে বাংলাদেশে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে, কেন ভাইরাস বেশি বিস্তার বাড়ে বা কমে-সেটা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। হয়তো ভাইরাসটি চরিত্র বদল করে ক্ষমতা বাড়িয়েছে। কারণ প্রত্যেকটা দেশেই আমরা দ্বিতীয় দফার একটা সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি।’

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *