কুমির চাষে বিদেশি অর্থ আসছে দেশে

কুমিরকে ভয় পায়না এমন সাহসী মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। ভয়ঙ্কর এই উভচর প্রাণীর নামটি শুনলেই অনেকের গাঁ শিউরে ওঠে। তবে বিশ্ব বাজারে কুমিরের চামড়া, মাংস,

হাড়, দাঁত চড়া দামে বিক্রি হয়। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিটি কুমিরের চামড়া

৫ থেকে ৬শ’ ডলার মূল্যে রপ্তানি করা হয়। আর তাই ঝুঁকি নিয়ে ভয়ঙ্কর কুমিরকে পোষ মানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কুমিরের খামার। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে উথুয়া ইউনিয়নের হাতিবেড় গ্রামে ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছে কুমির। দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই খামার।

আরেকটি কুমির খামার থাকলেও এটি বাংলাদেশের প্রথম। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ২০০৪ সালে এ ব্যতিক্রমী খামারের যাত্রা শুরু। ১৫ একর জায়গা জুড়ে বাণিজ্যিক খামারটি গড়েন ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ ও মেজবাউল হক। মূলত দু’জনেই ভ্রমণপিপাসু ছিলেন। চাকরি ও লেখাপড়ার সুবাধে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। তখনই উদ্যোক্তা হয়ে কুমির চাষ শুরু করেন। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম তারাই মাত্র ৭৫ টি কুমির দিয়ে শুরু করেন খামার। বর্তমানে এখানে ৩ হাজারের বেশি কুমির রয়েছে। খামার কর্তৃপক্ষের

তথ্য মতে, ২০১০ সালে জার্মানিতে হিমায়িত ৬৯টি কুমির বিক্রির মধ্য দিয়ে রপ্তানির খাতা খোলেন তারা। পরে ২০১৪, ১৫,১৬,১৮ ও ২০১৯ সালে জাপানে ১ হাজার ৫শ ৭টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া জাপানে রফতানি করা হয়েছে। প্রতিটি চামড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ ডলার করে। এই প্রকল্পে বর্তমানে ২৫ জন কর্মচারী কাজ করেন। এক দুই বছরের মধ্যে প্রতি বছর কুমিরের ১ হাজার চামড়াসহ মাংস রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কুমিরগুলো ৮ থেকে ১০ বছর বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে। বছরে একবার বর্ষাকালে গড়ে ৪৫ থেকে ৬০টি ডিম দেয় কুমির। এসব ডিমের ৮০ শতাংশ থেকে বাচ্চা পাওয়া যায়। কুমিরের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ৮০ থেকে ৮৫ দিন লাগে। এছাড়া কুমিরের চামড়া ৩ বছর বয়সেই রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি যোগ্য কুমিরকে ডিম ফোটানোর পর থেকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পুকুরে পরিচর্যা করতে হয়। চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার আগে কুমিরকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে অজ্ঞান করে কাটা হয়। তারপর প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা চামড়া প্রক্রিয়াজাত

করেন। এ খামারে এসব কাজ করেন নারী শ্রমিকরাই। প্রক্রিয়াজাতের পর লবণ দিয়ে চিলিং রুমে চামড়া মজুদ রাখা হয়। কুমিরগুলোর ডিম ফোটানোর জন্য অত্যাধুনিক ইনকিউবেটর রয়েছে। এছাড়া কুমিরের বাচ্চার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে হ্যাচারি ও পৃথক শেড। চামড়া প্রসেসিং জোন, চামড়া মজুদ রাখার জন্য চিলিং রুম, ব্রিডার পুকুর রয়েছে এ খামারে। খামারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মালয়েশিয়া থেকে ১৫টি পুরুষ কুমিরসহ ৭৫টি কুমির আনা হয়। যার জন্য তাদের ব্যয় হয় প্রায় সোয়া কোটি টাকা। বিশেষ ধরণের পুকুরে দেশীয় আবহাওয়ায় লালন-পালন করে থাকেন তারা। তবে প্রথম দিকে আবহাওয়া ও পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে ৫ থেকে ৭টি ব্রিডার কুমির মারা যায়। তারপরও বাকি কুমিরের বংশ বৃদ্ধি করে সফলতা পেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকে এসব কুমির বাঁচিয়ে রাখা, ডিম পাড়ানো, ডিম সংরক্ষণ এবং বাচ্চা ফোটানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশয় দেখা দিলেও অল্পদিনেই বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে ওঠে কুমিরগুলো। পরে কুমিরগুলো ডিম দিতে শুরু করে। তা থেকে বাচ্চা ফোটানোও শুরু হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপক আরিফ আরও বলেন, এক বছর বয়স পর্যন্ত কুমিরকে প্রতিদিন একবার খাবার দেয়া হয়। এক বছর বয়স থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত কুমিরকে সপ্তাহে পাঁচ দিন করে খাবার দেয় এবং দুই বছর থেকে তিন বছর বয়স পর্যন্ত সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন এবং ব্রিডার কুমিরকে সপ্তাহে এক দিন খাবার দেওয়া হয়। খাদ্যের জন্য ছোট কুমিরকে গরু ও মুরগি মাংসের কিমা এবং মুরগির মাথা দেওয়া হয়। ব্রিডার কুমিরকে বয়লার মুরগি, গরুর মাংস ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ খেতে দেওয়া হয়। ফলে তারাতাড়ি বড় হয় কুমির। এছাড়া কুমিরের খাবারের জন্য ফার্মের নিজস্ব ব্রয়লার মুরগির খামার ও মাছের পুকুর রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এ প্রজাতির কুমির সাধারণত ঘাস, লতাপাতা জড়ো করে বাসা তৈরি করে ডাঙ্গায় ডিম দেয়। এক জোড়া কুমিরের জন্য সাধারণত ৮০ বর্গ মিটার জায়গা লাগে। তবে বাণিজ্যিকভাবে সাধারণত লোনা পানিতে এ প্রজাতির কুমিরের চাষ করা হয়। বাংলাদেশ বনবিভাগ নতুন উদ্যোগক্তাদের জন্য যুগোপযোগী ও সহায়ক নীতিমালা তৈরি করেছে। যা নতুন উদ্যোগক্তাদের উৎসাহিত করবে। ফলে কুমির চাষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস হতে পারে ও সৃষ্টি করতে পারে অনেক কর্মসংস্থান। নতুনরাও কুমির চাষে সফল হবার ব্যাপক সম্ভভাবনা রয়েছে। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো.বশির উদ্দিন খান বলেন, এ ব্যবসায় পুজি বেশি লাগে। আর তাই যারা বড় পরিসরে ব্যবসা করতে আগ্রহী তারা কুমির চাষে এগিয়ে আসতে পারে। ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে ওঠা কুমির খামারটি বাংলাদেশে কুমির চাষে সফলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, দেশে বড় পরিসরে কুমির চাষে আগ্রহী হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যবসায় ক্ষতির সম্ভাবনা খুব কম। কুমির খামারে বেকার শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের বাজারে কুমিরের কোনো চাহিদা না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অন্য প্রাণির তুলনায় কুমির কম যত্নে বেশি দিন বেঁচে থাকে। এ ব্যবসায় উচ্চবিত্তরা এগিয়ে আসলে লাভবান হবে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা একেএম রুহুল আমিন বলেন, আন্তার্জাতিক বাজারে চামড়ার কদর থাকায় প্রতি বছরেই বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে খামারিরা চামড়া রপ্তানি করছে। দেশে কুমির চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার কুমির চাষিদের নানাভাবে উৎসাহিত করছে। কেউ শর্ত মেনে আবেদন করলে পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেওয়া হবে।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *