মালা গেঁথে চলে ছোট্ট বাবলির জীবন

প্লাস্টিকের ম্যাট বিছানো মেঝের ওপর পলিথিনের ব্যাগটি নানা রকমের রং ও আকৃতির পুঁতিতে ঠাসা। সুই-সুতায় পুঁতিগুলো বিন্যস্ত করে মালার রূপ দিচ্ছিল ১৩ বছরের

বাবলি। মা রুমা আক্তার নিজের কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে নকশা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন মেয়েকে। কোন রঙের পুঁতি কয়টা এক সারিতে পড়বে, তা গুনে গুনে গাঁথছিল বাবলি।

মাঝেমধ্যেই ওর গোনায় গরমিল হচ্ছিল। তখন মেঝেতে অসম্পূর্ণ মালাটি রেখে জোরে শব্দ করে পুঁতি গুনে যায় সে। অন্যদের তুলনায় বাবলির কাজের গতি ধীর। অটিজম বাবলির কাজ কিছুটা কঠিন করে তুললেও থামাতে পারেনি। সেদিন সকালে মায়ের সঙ্গে একটি পাইলট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বাসায় ফেরে বাবলি। রাজধানীর হাজারীবাগে অটিস্টিক শিশু ও নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি পরিচালিত হয় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির আওতায়। প্রশিক্ষণটি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে হয় বলে

নিয়মিত শেখার সুযোগ নেই। যখন ডাক পান, মেয়েকে নিয়ে যান মা রুমা আক্তার। তবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে নয়, পুঁতির মালা বানানোর কাজ মায়ের কাছেই শিখছে বাবলি। বাবলির পুরো নাম বাবলি আক্তার। তবে বাসায় ওকে দোলন বলেই ডাকা হয়। বাবা মো. বাবুল ও রুমা আক্তার দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বাবলি বড়। রাজধানীর চকবাজারের পোস্তা এলাকার এক গলিতে ঠায় দাঁড়িয়ে ছয়তলা একটি ভবন। ভবনের পাঁচতলায় দুই কক্ষের একটিতে পাঁচজনের সংসার বাবলিদের। সেখানেই কথা হয় বাবলির মা রুমা আক্তারের সঙ্গে। রুমা আক্তার বলেন, জন্মের সময় খিঁচুনি ওঠে বাবলির। হাসপাতালে নিলেও চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। কিছুটা বড় হওয়ার পর বুঝতে পারেন বাবলি স্বাভাবিক সক্ষমতার শিশু নয়। তিনি জানালেন, পুঁতির মালা বিক্রি করে সংসারে আয় আসে। মালার যে অর্ডার পান, তার বেশির ভাগই করে দেয় বাবলি। বাবলির মা যখন এসব কথা বলছিলেন, মালা তৈরির কাজ থেকে চোখ তুলে বারবার তাকাচ্ছিল বাবলি। বাবলির পাশেই তার ছোট দুই

ভাই-বোন বসা। বাবলির ছোট ভাই ইয়াসিন হোসেন রুমানের বয়স ৯ বছর। ছোটবেলায় সিঁড়ি থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর থেকেই অসুস্থ রুমান। ছোট বোন নুসরাত জাহান বুবলির বয়স এক বছর। তিন সন্তানের মা রুমা বললেন, ‘আমরা মা-মেয়ে দুই বছর ধরে মতির মালা গাঁথি। মাথার ক্লিপে মতি ভরে ডিজাইন করি। চকবাজারের একজন অর্ডার দেয়। ১৪৪ পিচ বানালে ১০০ টাকা। আমি নানা কাজ করি। তাই মালার কাজের বেশির ভাগ বাবলিই করে। সপ্তাহে ৬০০ টাকা পাই।’ কথায় কথায় রুমা বলেন, মালা গাঁথার কাজটি আনন্দ নিয়েই করে বাবলি। কাজে থাকার কারণে বাবলির শারীরিক চর্চা হচ্ছে। সৃজনশীলতাও বাড়ছে। বললেন, ‘আমার কষ্টের জীবন। দুই ছেলে-মেয়ে কপালের দোষে প্রতিবন্ধী। ছয় বছর বয়সে বাবলিকে স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেছিলাম। বলল, তারা প্রতিবন্ধী ভর্তি নেয় না। ছেলে মাঝেমধ্যে এমন অত্যাচার করে যে শিকল দিয়ে বাইন্ধা রাখি। বাবলিকে বলি, মা তোমার তো বড় হইতে হইব। তুমি যদি কাজ না শেখো তাইলে ক্যামনে চলবা?’ মাকে সান্ত্বনা দিতেই যেন বাবলি বলে উঠল, ‘মালা বানাতে আমার ভালো লাগে। কষ্ট হয় না…

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *