কোলাহল মুক্ত সমুদ্র তীরে কেবলই ঢেউয়ের গর্জন

সমুদ্র তীরে নেই কোনো কোলাহল, কেবলই শোনা যায় ঢেউয়ের গর্জন। চারদিকে সুনশান নিরবতা। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঢেউয়ে গা ভাসাচ্ছে

কুকুরের দল। তাদের মধ্যেও ছিল না কোনও সাড়া শব্দ। বালিয়াড়িতে অবস্থান নিয়েছে দু’টি গরুর দল; যেখানে রয়েছে ১৫টির বেশি গরু। তবে

দেখা যায়নি কোনও রাখালকে। শুক্রবার (০২ এপ্রিল) করোনার সংক্রমণ বাড়ায় বন্ধ করে দেয়া বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে দেখা মেলে এমনই দৃশ্যের। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সমুদ্র সৈকতের লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত যেখানে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে সেখানে শুক্রবার ফাঁকা ছিল পুরো সৈকত। ছিল না ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক, জেড স্কি চালক, কিটকট ব্যবসায়ী বা হকারদের দৌরাত্ম্য।

পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের সহস্রাধিক দোকানপাটও। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সাগরের স্বচ্ছ পানির টানে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন এই সৈকতে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ বাড়ায় প্রতিটি প্রবেশদ্বারে ট্যুরিস্ট পুলিশের কড়া পাহারা। সৈকতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না কাউকে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বাধার মুখে হতাশা নিয়েই অনেক পর্যটককে ফিরতে হচ্ছে প্রবেশদ্বার থেকে। তাদের

মতে, সৈকত বন্ধের ঘোষণা আগে দিলে এই সমস্যায় পড়তে হত না। আলী নামে এক পর্যটক তার ১০ বছরের ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন সৈকতের বিচ মার্কেট দিয়ে। কিন্তু ট্যুরিস্ট পুলিশের বাধার মুখে প্রবেশ করতে পারলেন না সৈকতে। আলী বলেন, কাজের সূত্রে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম। সকালে ছেলেকে নিয়ে সৈকত দেখতে এসে বিপাকে পড়লাম। তবে দূর থেকে সৈকত দেখে চলে যেতে হচ্ছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর শেখেরটেক থেকে কক্সবাজার ভ্রমণে আসা খুকি নামে এক নারী পর্যটক বলেন, আগে থেকে কক্সবাজার সৈকত বন্ধ

ঘোষণা করলে এই বিপদে পড়তে হত না। এত কষ্ট করে প্রস্তুতি নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণে এসেছি; আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের তো বার বার কক্সবাজার আসা সম্ভব না। এত অনুরোধ করার পরও সমুদ্রে পা ভেজানোর জন্য নামতে দিল না পুলিশ। রিদুয়ান নামে আরেক পর্যটক বলেন, যদি কক্সবাজারগামী বাসগুলো বন্ধ থাকতো তাহলে কোনো সমস্যা হত না। এখন গাড়ি চলাচল করছে; আর কক্সবাজার এসে সৈকতে প্রবেশ করতে পারছি না। এখন মহাবিপদে পড়ে গেলাম কক্সবাজার বেড়াতে এসে। এদিকে, কক্সবাজারে রয়েছে সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল,

মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। এগুলো খোলা থাকলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৫০ শতাংশ রুম চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। তবে পর্যটন স্পট বন্ধের ঘোষণায় পর্যটকরা কক্সবাজার ছাড়ছেন। হোটেল প্রসাদ-প্যারাডাইসের ম্যানেজার আরিফ বলেন, করোনার পরিস্থিতিতে প্রশাসন ৫০ শতাংশ রুম ভাড়া দেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু এখন সৈকত যেহেতু বন্ধ; পর্যটকরা তো কক্সবাজার ছাড়ছে। ফলে হোটেলে ৫০ শতাংশ না, পুরো হোটেলেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারকামান হোটেলের এক ম্যানেজার বলেন, করোনার কারণে সবকিছু মেনে নিতে হবে। বৃহস্পতিবার অর্ধ-শতাধিক পর্যটক হোটেল ছিল। কিন্তু সবাই শুক্রবার দুপুরে রুম ছেড়ে কক্সবাজার ত্যাগ করেছে। আর রমজানের আগ পর্যন্ত

যে রুমগুলো বুকিং হয়েছিল তাও বাতিল করেছে পর্যটকরা। এদিকে, শুক্রবার দুপুরে সৈকত, সৈকত এলাকার দোকানপাট ও হোটেল মোটেল জোন পরিদর্শন করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আল আমিন পারভেজ। এসময় তিনি বলেন, যাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেখতে এসে প্রবেশ না করে চলে যেতে হচ্ছে; তাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। তারা বন্ধের ঘোষণাটি আগেই জানলে সত্যিই ভালো হত। তবে যারা এসেছেন তাদের প্রতি অনুরোধ সৈকত এলাকা পরিহার করুন। তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের যে নির্দেশনা ছিল করোনার উচ্চ ঝুঁকি এলাকাগুলোতে ভ্রমণ পরিহার করা ও সমাবেশ বন্ধ রাখা। দেখেন দু’সপ্তাহ আগেও কক্সবাজারে করোনার

সংক্রমণ খুবই কম ছিল। মাত্র ২-৩ শতাংশ করোনার টেস্ট হত। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে এটা ১০ শতাংশে উঠে গেছে। ডাক্তাররা বলছেন, দেশের অন্যান্য স্থানে যারা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের অনেকেরই দেখা গেছে কক্সবাজারসহ অন্যান্য পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে যাওয়ার। সংখ্যার দিক থেকে কক্সবাজার এখনো কম সংক্রমিত হলেও কিন্তু কক্সবাজার একটা বিশেষ বিবেচনায় উচ্চ ঝুঁকিযুক্ত এলাকা। সুতরাং, করোনার সংক্রমণ রোধে সবার একটু কষ্ট হলেও বিধি-নিষেধগুলো মেনে নিতে হবে। হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির দেয়া তথ্য মতে, কক্সবাজারে এখনও ৩০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। তবে সমুদ্র সৈকতসহ পর্যটন স্পটগুলো আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারিভাবে বন্ধ ঘোষণার পর পর্যটকরা কক্সবাজার ছাড়ছেন বলেও জানান তারা।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *