লকডাউনের ফাঁদে ইফতারির বাজার

লকডাউনের ফাঁদে পড়েছে রাজধানীর ইফতারি বাজার। পুরান ঢাকার চকবাজার ও বেইলি রোডের অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই এখন

রমজান মাস চলছে। অথচ দুই বছর আগে রমজানে ঐতিহ্যবাহী দুই এলাকায় মানুষের ভিড়ে গম গম করত। ইফতারি সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত

এলাকায় বিকালে ঢুকতে গেলে যে কাউকে বেশ বেগ পেতে হতো। কিন্তু সে চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, চকবাজার শাহী জামে মসজিদ এলাকা পুরো ফাঁকা। যেন এক অচেনা সড়ক। হাতে গোনা স্থায়ী কয়েকটি হোটেলে বিক্রি হচ্ছে ইফতারি। সেখানেও ভিড় নেই। নানান পদের ইফতারি থাকলেও ক্রেতা নেই। ক্রেতা সংকটে ভুগছেন ব্যবসায়ীরা। একই দৃশ্য বেইলি রোডেও। এছাড়া

মালিবাগ, মগবাজার, ফার্মগেট, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার চিত্র প্রায় একইরকম। একই সঙ্গে সব জায়গায় পুলিশের বিশেষ তৎপরতা চোখে পড়ে। বাপ-দাদাসহ বংশপরম্পরায় চকবাজারের শাহী জামে মসজিদ রোডে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা নিয়া যায়’ নামের ইফতারি বিক্রি করছেন মো. হোসেন (৬৫)। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আমার দাদা ও বাবা এ ব্যবসা করে গেছেন।

আমিও করছি। কিন্তু গত বছর এবং এ বছর যে অবস্থা তা জীবনে কখনো দেখিনি। করোনাভাইরারের কারণে ঐতিহ্যবাহী এ ইফতারির ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছে। আগে রমজানে দিনে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার ইফতারি বিক্রি করতাম। আমার দোকানে ১০-১২টি ছেলে কাজ করত। বিকাল বেলা ইফতারি বিক্রি করে তাল পাইতাম না। এখন সামান্য কিছু বিক্রি হলেও এতে কিছুই হয় না। বলতে গেলে দোকান বন্ধই রয়েছে। এ রোডের স্থায়ী হোটেল আনন্দ সুইটমিটের ম্যানেজার মাইদুল ইসলাম জানান, আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইফতারির পসরা সাজিয়েছি। কিন্তু ক্রেতা

আসছেন না। আলাউদ্দিন সুইটমিটের ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ বলেন, তার দোকানে চিকেন স্টিক, চিকেন নাগেট, চিকেন উইয়িন্স, দই বড়া, ডিমের চপ, বাদামের শরবত, জালি কাবাব, চিকেন সমুচা, পনিরের সমুচা বিভিন্ন পরোটা রয়েছে। অন্য বছর যা বিক্রি হতো তার চারভাগের একভাগও বিক্রি হচ্ছে না। দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার। একই অবস্থা অ্যাপল ফুডসহ অন্য দোকানেরও। ইফতারি কিনতে আসা পানির ফিল্টার ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল বলেন, করোনাভাইরাস ঢাকার ৪০০ বছরের ঐতিহ্য বিলীন করে দিয়েছে। প্রতি বছর রমজানে প্রতিদিন

এ শাহী জামে মসজিদ রোড থেকে ইফতারি কিনে বাসায় নিয়ে যাই। কিন্তু এবার ইফতারি কিনে মন ভরছে না। ভাবছি এরপর বাসায় ইফতারি তৈরি করতে বলব। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সামাদ বলেন, একেবারে ছোটবেলা থেকে যে দৃশ্য দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে গেলাম, সেই দৃশ্য করোনা পাল্টে দিয়েছে। চকবাজার এলাকায় বিকালে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা চোখে পড়ে। পুলিশের পেট্রোল ইন্সপেক্টর আল মামুন ভুঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর করার। দেখি কতটা ধরে রাখা যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থায়ী

হোটেলগুলোতে ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাতে কাউকে বসতে দিচ্ছি না। রমজানেও রাজধানীর বেইলি রোড খাঁ খাঁ করছে। সেখানে অস্থায়ী ইফতারির কোনো দোকানই চোখে পড়েনি। স্থায়ী দোকানগুলোতেও তেমন ভিড় নেই। এখানকার শাহী মামা পিঁয়াজু নামের স্থায়ী হোটেলটির সামনে ইফতারির ব্যাপক আয়োজন চোখে পড়ে। চিকেন রোল, জালি কাবাব, চিকেন চপ, কলিজা সিঙ্গাড়া, ছোলা, আলু ও ডিমের চপ, সবজি পাকোরা, মামা হালিমসহ নানা ধরনের ইফতারি। কিন্তু বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ক্রেতার চাপ চোখে পড়েনি। একটি দোকানের কর্মচারী মোশারফ হোসেন জানান, স্বাভাবিক সময় হলে আপনার সঙ্গে কথা বলতেই পারতাম না। বিক্রির চাপ থাকত। কিন্তু এখন দেখেন ক্রেতাই নেই।

আমরা খুব হতাশায় রয়েছি। একই মন্তব্য করেন, এ ওয়ান ফুড অ্যান্ড পেস্ট্রির কর্মকর্তারা। বেইলি রোডে বিভিন্ন স্থানে স্থানে দেখা মেলে খাবার সরবরাহকারীদের। তারা বাসায় বাসায় খাবার সরবরাহ করেন। ‘পাঠাও’- এর কর্মী শামীম জানান, বুধবার ৩-৪টি অর্ডার ডেলিভারি করে ১২০ টাকার মতো আয় করেছিলাম। এখন পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার পাঁচটা বিকাল) মাত্র একটি অর্ডার পেয়েছি। সন্ধ্যা নাগাদ হয়তো অর্ডার বাড়তেও পারে। সেই আশাতে বসে আছি। প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন ফাহিম আহমেদ, শফিকুল ইসলাম এবং সহজ ডট কমের বাহরাম বাদশা। বেইলি রোডে ৪৪ বছর ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন বাবুল (৫৫)। তিনি বলেন, রমজান এলে শুধু মুড়ি বিক্রি করেই অনেক টাকা আয় করতাম।

কিন্তু এ বছর মুড়ি নিয়ে বসে আছি। বিক্রি তেমন নেই বললেই চলে। ফার্মগেটের স্টার কাবাব অ্যান্ড বেকারি এবং স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে ইফতারি পসরা নিয়ে বসেছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিকাল পর্যন্ত ক্রেতাদের তেমন ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি। রাজধানীর অন্য স্থানের চিত্রও একইরকম।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *