‘রাসূলের (সা.) মেরাজের ইতি কথা’

বিশ্ব নবীর মেরাজ সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য কলম ধরার সৌভাগ্য যে আল্লাহ দান করলেন তার মহান দরবারে জানাই লাখো কোটি নজরানা।

হৃদয় উজাড় করা সবটুকু আবেগ অনুভূতি নিয়ে অন্তরের মণিকোঠা থেকে অসংখ্য দরুদ ও সালাম জানাই পিয়ারা নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্

(সা.) তার আসহাব ও আহ্লে বাইতগণের প্রতি। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত ও ৪৫ জন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সাহাবির বর্ণনা অনুযায়ী হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নবীকুল শিরোমণির মেরাজ। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গ্রন্থ লিখন, কলাম লিখন, বর্ণনা- বিবৃতি কোনো কিছু দিয়েই এমন অলৌকিকতার বয়ান বোঝানো বা শেষ করা সম্ভব নয়। তাই ভাবছি অক্ষম হস্তে- নরাধমের কলম দ্বারা কীভাবে ফুটিয়ে তুলব সৃষ্টির দুলালের মেজারের বৃত্তান্তকে?

তবুও ইমানি জজবা নিয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ ভরসা ও মদিনাওয়ালার নেকনজর কামনা করে শুরু করলাম। বাকি তার দয়ার পথের মুসাফির হয়ে থাকব। মেরাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ- সিঁড়ি। ইসলামি পরিভাষায় এর অর্থ উচ্চমর্যাদা, আধ্যাত্মিক পূর্ণতা, ঊর্ধ্বলোকে গমন, বিশেষত আল্লাহর নৈকট্য লাভ। রাসূলের মেরাজকে ইস্রা নামে ও নামকরণ করা হয়েছে। মশহুরগণের মতে, ইস্রা ও মেরাজ একই বাস্তবতার দুটি ভিন্ন ভিন্ন নাম। ইস্রা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ, নৈশ ভ্রমণ, লয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যেন স্থান হিসাবে ওই ভ্রমণের নাম মেরাজ আর কাল হিসাবে ইস্রা।

মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ইস্রা আর আকসা থেকে ঊর্ধ্বলোক পর্যন্ত ভ্রমণকে মেরাজ বলেও মন্তব্য পাওয়া যায়। সাহাবিরা কখনো ইস্রা শব্দ বলে মেরাজ বোঝাতেন, আবার কখনো শুধু ঊর্ধ্বলোকে গমন অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করতেন। মেরাজ বা ইস্রা ঘটনা দুটি রাত্রিকালে সংঘটিত হয়েছিল যে কারণে ইস্রা শব্দটি উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মেরাজ একটি সফর। ওই সফর ছিল ‘আলমে-মূলক থেকে ‘আলমে-মালাকুত ‘আলমে-জাবারুত ও ‘আলমে-লাহুত পর্যন্ত। ‘আলমে মুলক ছিল হাবিবে খোদার (সা.) বাশারী হাকিকতের বিকাশ, ‘আলমে

মালাকুতে মালাকি- হাকিকতের বিকাশ, ‘আলমে জাবারুত ও লাহুত ছিল হাক্কি হাকিকতের বিকাশ। ওই সফর ছিল একজনের ভ্রমণ আর একজনের গ্রহণের সফর। রাসূলে দোজাহা ছাড়া অন্য কোন নবী-রাসূল, ফেরেশতা, জিন, মানব সন্তান তথা সৃষ্টিজগৎ এমন মর্যাদাপূর্ণ সফরের গৌরব অর্জন করতে পারেননি। মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাসূলের ভ্রমণ এবং মেরাজের ঘটনা ২৭ রজব রাতে সংঘটিত হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ২৭ রজব মেরাজের স্মৃতি বার্ষিকী মুসলিম বিশ্বে পালিত হয়ে থাকে। দয়াল নবীর মেরাজ সংঘটিত

হয়েছিল নবুয়্যতের ১২ সালে। কুরাইশদের তীব্র অত্যাচার, রাসূলের সহধর্মিণী হজরত খাদিজার ইন্তেকাল, চাচা আবু তালেবের মৃত্যু, তায়েফ গমনের হৃদয়বিদারক ঘটনা প্রভৃতি কারণে যখন রাসূল (সা.) সীমাহীন ব্যথিত ছিলেন- তখন পবিত্র মেরাজের সফরে হাবিবকে ধন্য করেন আল্লাহতায়ালা। কুরআন মাজিদের সূরা বানি ইসরাইলের ১নং আয়াতে সূরা নাজম-এর ১-১৮নং আয়াতে এবং সূরা তাকভীরের ১৯-২৪নং আয়াতগুলোয় মেরাজের ঘটনা উল্লেখ আছে। এর মধ্যে সূরাতুল ইসরার (বানি ইসরাইল) সমগ্র অংশেই মেরাজের বিভিন্ন অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।

প্রথমদিকে রাসূল (সা.)-এর মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণের বর্ণনা, মধ্য ভাগে উপদেশ ও নসিহত। অতঃপর পার্থিব দুঃখ কষ্ট ভোগ করার কারণে মুমিনরা যাতে ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত হৃদয় না হয়, তদুদ্দেশ্যে পূর্বজুগীয় নবী-রাসূলদের ঘটনাবলি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতদসহ ইসলামের শত্রু কুরাইশদের শান্তি সমন্ধে সতর্ক করে দেওয়া, প্রসঙ্গক্রমে ইঙ্গিতে রাসূল (সা.) কে হিজরতের আদেশ দেওয়া, অতঃপর মুসলিম উম্মাহর প্রতি মেরাজের প্রতিক্রিয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সবশেষে মুমিনদের মধ্যে সাহস সঞ্চালনের উদ্দেশ্যে মূসা (আ.) মিসর থেকে হিজরতে বাধ্য হওয়ার কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। বন্ধুর মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ

কুরআন মাজিদের সূরা নাজমের ১-১৮ ও সূরা তাকভীরের ১৯-২৪নং আয়াতে মানবাত্মার আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভের সর্বশেষ স্তরের কথা বর্ণনা করেছেন। কতটা কাছে আল্লাহ তার হাবিবকে (সা.) নিয়েছিলেন কুরআনের বর্ণনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়- ‘ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুক পরিমাণ অথবা তারচেয়েও অল্প দূরত্ব রহিল’ (সূরা নাজম; আয়াত-৯)। বলা প্রয়োজন এ স্তরে পৌঁছা সত্ত্বেও মানবাত্মা মানবাত্মাই থেকে যায়, সে আল্লাহ্ হয়ে যায় না। সে নিশ্চই আল্লাহ্তে আত্মা বিলীন হয়ে যায়। আল্লাহ্র মুখ দিয়ে কথা বলেন এবং তার ইচ্ছানুযায়ী প্রতিটি কার্য করে থাকেন। মেরাজবিষয়ক আলোচনায় সালাতের বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বের অধিকারী। এ কারণেই হাদিসে সালাতকে মুমিনের মেরাজ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর মহিমা, নিজের অক্ষমতা এবং তার প্রতি স্বীয় দাসত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে বান্দা সিজদায় লুটিয়ে পড়ার পর যখন নিজেকে

আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণরূপে উপস্থিত অথবা উপস্থিত হওয়ার যোগ্য দেখে তখন সে তার খিদমতে যাবতীয় তাহিয়্যাত, সম্মান ও সালাম পেশ করেন এবং নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তাঁর পথপ্রদর্শক রাসূল (সা.) ও যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তখন আল্লাহ্ রাসূলকে ‘হে নবী! আপনার প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকতগুলো নাজিল হউক।’ এ তুহফা দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। আল্লাহ্ পাকের জান্নাতি অভিবাদন পাওয়ার পর রাসূল (সা.) ‘আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেককার বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’ বলে জবাব প্রদান করেছিলেন। মেরাজের রাতে রাসূল (সা.) হজরত আবুজার গিফারির ঘরে মতান্তরে হজরত উম্মে হানীর

ঘরে মতান্তরে- কাবার হাতিমে নিদ্রাবস্থায় ছিলেন। জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আগমন করেন এবং বুরাক মারফত মেরাজে রওনা হন। হাবিবে খোদা মেরাজের জন্য ঊর্ধ্বলোকে গমনের আগে আম্বিয়া কিরামদের রুহগুলো বাইতুল মাকদিসে রাসূলকে (সা.) অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। তিনি সেখানে ২ রাকাত সালাত আদায় করেন। সালাতে সবাই রাসূলকে নিজেদের ইমাম মনোনীত করেছিলেন। বাইতুল মাকদিস থেকে ঊর্ধ্বলোকে গমন করলে প্রতিটি আসমানে রাসূলরা সাদর সম্ভাসন জানিয়েছেন রাসূলে খোদাকে (সা.)। প্রথম আসমানে আদম (আ.) দ্বিতীয় আসমানে ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ.) তৃতীয় আসমানে ইউছুফ চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস পঞ্চম আসমানে হারুন ষষ্ঠ আসমানে মূসা এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহিম (আ.) সাদর সম্ভাসন জানিয়েছেন। রাসূল যখন এক আসমান থেকে অন্য আসমানে উঠছিলেন জিবরাইল তার জন্য প্রতিটি আসমানের দরজা খুলে দেওয়াচ্ছিলেন। এভাবে ঊর্ধ্ব আরোহণ করতে করতে রাসূল এমন এক স্থানে পৌঁছালেন- যেখান থেকে দপ্তরে কলম

চলার আওয়াজ আসছিল। ওই স্থানে সালাত ফরজ হয়। সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন- ‘তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও এবং তুমি নিজেও উহাতে অবিচল থাক……..’ (সূরা তা-হা; আয়াত-১৩২)। ধারাবাহিক চলার গতিতে রাসূল সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছালেন। তৎপর জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করলেন। নবীজি জান্নাত পরিদর্শনে গেলে তাঁর সম্মানে ফুলের বাগানগুলো মধুর সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয়। জাহান্নাম পরিদর্শনে গেলে নবীজির সম্মানে জাহান্নামের আগুন নিভে যায়। রাসূলে আরাবির (সা.) মেরাজ সফরে জিবরাইল, মিকাইল (আ.)সহ ৫০ হাজার ফেরেশতা রাসূলের খেদমতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বোরাক নামক বাহন বেহেশত থেকে পাঠানো হয়েছিল। বোরাকের গতি ছিল বিদ্যুতের গতি। অবতরণকালে সামনের পা দু’খানা লম্বা ও আরোহণকালে পেছনের পা দু’খানা লম্বা হয়ে যায়। দৃষ্টির শেষ সীমানায় পা ফেলে বোরাক। তা ছাড়া রাসূলের মেরাজের ওই সফরে আরও ১০টি সোপান খেদমতের সৌভাগ্য লাভ করে বলে

জানা যায়। ইমামুল মুরসালিন (সা.) মেরাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর পবিত্র মক্কায় যখন এর চর্চা হচ্ছিল তখন প্রত্যেকই স্বীয় মানসিকতা অনুযায়ী এতদসম্পর্কে ধারণা করতে থাকে। কুরাইশরা রাসূলের কাছে জিজ্ঞেস করল যদি তুমি বাইতুল মাকদিস প্রত্যক্ষ করে থাক, তবে- উহার দৃশ্য বর্ণনা কর। এ প্রসঙ্গে সরদারে দোজাহার (সা.) একটি হাদিস পেশ করা হলো- ‘হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলকে বলতে শুনেছেন- মেরাজের ব্যাপারে কুরাইশরা যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করল তখন আমি কাবাগৃহের হাতিমে দাঁড়ালাম। তখন আল্লাহতায়ালা বাইতুল মাকদিস মসজিদ খানা আমার সম্মুখে প্রকাশ করে দিলেন। ফলে আমি উহার দিকে তাকিয়ে উহার চিহ্ন ও নিদর্শনগুলো তাদের বলে দিতে থাকলাম। (বুখারি- মুসলিম)। মরুর দুলালের মেরাজ ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী সফর। যা সাধারণ জ্ঞানে বোঝা বড়ই দুরূহ ব্যাপার। ওই সফরে চক্ষু দ্বারা দেখার জন্য যেসব শর্ত পূরণ আবশ্যক সেসব শর্তের যাবতীয় বাধা রাসূলের চক্ষু থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শ্রবণের সাধারণ নিয়মাবলি অপসারিত হয়েছিল এবং স্থান ও কালের সব দূরত্ব তাঁর জন্য সংকুচিত করা হয়েছিল। হাবিবে খোদার (সা.) মেরাজ রাতের বিচরণ যতদূর পর্যন্ত হয়েছিল তাতে তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য নবী-রাসূলদের সব শ্রেষ্ঠত্বকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বাইতুল মাকদিসে মুসল্লি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন নবী-রাসূলদের আত্মাগুলো, বাইতুল মামুরে ফেরেশতাকুল। ধন্য হয়েছিল আকাশ-বাতাস, আরশ,

কুরসি, লাওহে-মাহফুজ, কলম, জান্নাত-জাহান্নাম তথা ঊর্ধ্বজগৎ। মেরাজের রাতে সৃষ্টির নিদর্শনগুলোয় বন্ধুকে দেখায়ে যুগ-জনমের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন আল্লাহ্, আর নিদর্শনগুলো দেখে চক্ষু শীতল করেছিলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। একান্ত সান্নিধ্যের সফরে নিজস্ব পরিবেশে ঊর্ধ্ব দিগন্তে দুই ধনুকের ব্যবধানে নিকটবর্তী হয়ে যা অহি করার তা অহি করে- পরিপূর্ণ আত্মিক শক্তি সম্পন্ন করে দিলেন- মহান আল্লাহ্ তার হাবিবকে (সা.)। ১৪০০ বছর পর আল্লাহর হাবিবের মেরাজের স্মৃতিবার্ষিকী দিবস তথা মেরাজুন্নবীর (সা.) লিখনীতে আমাদের মিনতি হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের অন্তরে রাসূলের প্রেম দান করুন।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *